এলএনজিকে কয়লার বিকল্প ধরা হলে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তির অগগ্রতি যেভাবে ব্যাহত হতে পারে

07 মে 2021 by Faisal Azim

সাইমন নিকোলাস

নবায়নযোগ্য শক্তি সস্তা এবং আমদানি করা এলএনজির চেয়ে বেশি টেকসই, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোজ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে

বিদেশী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে যারা এ অঞ্চলে টাকা কামাতে চায়, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো উদীয়মান বাজার কাছে খুব লোভনীয়।  এই দেশগুলো যদি কয়লা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমদানি করা এলএনজিতে (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মনোযোগী হয়, তবে তারা  অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত - উভয় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হবে।  এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা শুধু নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগই বাধাগ্রস্থ করবে না, বরং মহাদেশজুড়ে জলবায়ু উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত করবে।

মার্কিন গ্যাস টারবাইন কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) বাংলাদেশে তাদের গ্যাস প্রযুক্তি বিক্রির জন্য দর কষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে, যা আসলে দেশে মার্কিন এলএনজি আমদানির পথ প্রশস্ত করবে।  এদিকে জাইকা বাংলাদেশের নতুন বিদ্যুতের পরিকল্পনা তৈরিতে সহযোগিতা করবে বলে মার্চের শুরুতে একটি চুক্তি করেছে।

জাইকা বলছে তারা বাংলাদেশে একটি ‘নিম্ন বা শূণ্য কার্বন নির্গমন করে এমন জ্বালানীব্যবস্থা’র উত্তরণে ভূমিকা রাখবে।  পরিবেশের দোহাই দিয়ে আমদানিকৃত গ্যাসের বহুল ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে যা হচ্ছে নির্জলা মিথ্যা, কারণ এলএনজির পূর্ণ জীবনচক্রে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কয়লার সমান।  আর্থিক ঝুঁকি বিবেচনায়ও এলএনজি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

গ্রিডের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং সাশ্রয়ী মূল্যের জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য শক্তিতে প্রাধান্য দেওয়া উচিত

বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যুতের পদ্ধতিগত সমস্যা সমাধানের সুযোগ রয়েছে।  বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করতে যাচ্ছে।  তবে গণমাধ্যমের খবর অনুসারে, এই কেন্দ্রগুলো এলএনজি-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবে।  এটি একটি মারাত্মক ভুল পদক্ষেপ হবে যা দেশের ক্রমবর্ধমান ওভারক্যাপাসিটি (স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা) পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তুলবে। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস পড়ে থাকলেও সরকারকে চুক্তির বাধ্যবাধকতার জন্য এসব কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই দুর্বল পরিকল্পনার ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়বে।  এর ফলে এই খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা পাকিস্তানের মতো ঝুঁকিতে পড়বে। পাকিস্তানে বাড়তে থাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্টের পরিমাণ ২০২৩ সাল নাগাদ বছরে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে।

এলএনজির দামের অস্থিতিশীলতা ও অস্বাভাবিক দাম বাড়া বাংলাদেশের জন্য একটি অসহনীয় বোঝা। এর মধ্যে দেশ যদি আরো বেশি এলএনজিমুখী হয় তাহলে এই ব্যয় বহন করা প্রায়অসম্ভবপর হবে ।  বিশ্বব্যাপী গ্যাস সংকটের কারণে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাস আমদানিকারক জাপানে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে বিদ্যুতের দাম বেড়ে রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়।  বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে, কিন্ত তা সরকারের মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার জন্য মোটেই জুতসই নয়।

এলএনজির তুলনায় নবায়নযোগ্য শক্তি বাংলাদেশের চাহিদা, অর্থনীতি এবং জলবায়ুর জন্য বেশি উপযোগী। বিদেশের বাজারে জ্বালানীর দামের অস্থিতিশীলতার প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য গ্রিড ব্যবস্থার টেকসই সম্প্রসারণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে।নবায়নযোগ্য শক্তিই সবচেয়ে কম কার্বন-নির্গমনকারী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানী ব্যবস্থা। 

নবায়নযোগ্য শক্তি বিকাশের গতি বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশের নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘোষণার আগমুহূর্তে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত  সৌরশক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।  স্রেডার দৃষ্টিতে এই নবায়নযোগ্য শক্তির ৪০% শতাংশ আসবে্ ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেল থেকে।  হিসাব করে দেখা গেছে তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল এবং অন্যান্য শিল্প ভবনের ছাদে ৫,০০০ মেগাওয়াট স্থাপন করা যাবে। একইভাবে, সরকারী ভবনগুলোতেও ২,০০০ হাজার মেগাওয়াট স্থাপন করা যেতে পারে।

২০২০ সালে ভিয়েতনামের ৯,০০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিস্ময়কর কৃতিত্বকে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের পক্ষে অবশ্যই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব।  তবে এলএনজিচালিত বিদ্যুতে বিনিয়োগে অধিক উৎসাহী হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।  নবায়নযোগ্য খাতে প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে সরকারকে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং সত্যিকার অর্থে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদী চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ভিয়েতনামের নতুন বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় সৌর বিদ্যুতের স্থান দখল করে নিচ্ছে এলএনজি

বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত উৎপাদন সীমিত করে ফেলছে। সেখানকার প্রচলিত অনেক জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্প যেখানে উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে সৌর বিদ্যুত প্রকল্পগুলো স্বল্প সময়ে প্রত্যাশার তুলনায় পাঁচগুণ বেশি বিদ্যুত উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে।

এতকিছুর পরেও, ভিয়েতনামের সর্বশেষ খসড়া দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি পরিকল্পনাতে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ গিগাওয়াট এলএনজি চালিত বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যেখানে সৌর শক্তি থেকে সংযুক্ত হতে যাওয়া বিদ্যুতের পরিমাণ ২ গিগাওয়াটেই আটকে আছে। এটা একটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত যেখানে সৌরশক্তি উৎপাদনে ভিয়েতনামের অভূতপূর্ব সাফল্য রয়েছে।  আর্থিক ও জলবায়ূ, উভয়দিক থেকেই এটা একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশের মতো ভিয়েতনামেও গ্রিড এবং ব্যাটারি স্টোরেজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে সৌর ও বায়ুশক্তির বিকাশ ঘটবে।  আশা করা যায় আগামী দশকে এই প্রযুক্তিগুলোর দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে আসবে।

এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানিতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির কোনো প্রয়োজন নেই কারণ এর ফলে সরকারের উপর চাপ বাড়ছে এবং বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য গ্রাহক এবং ব্যবসা বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাইকার জেনে রাখা দরকার যে এক জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আরেকটি অস্থিতিশীল দামের জীবাশ্ম জ্বালানিতে জোর দিলে তা ইতোমধ্যে বড় ধরণের আর্থিক ক্ষতির ভারে জর্জরিত বিদ্যুত ব্যবস্থার স্থায়িত্বের উন্নয়নে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

এশিয়ার এই দেশগুলোর আসলে কী প্রয়োজন সেই বিষয়ে বিদেশী সরকারগুলোর সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আমদানিকৃত এলএনজি তাদের চাহিদার সামান্যই পূরণ করতে সক্ষম।  এসব দেশ বরং নবায়নযোগ্য শক্তির বিকাশের জন্য বেশি উপযুক্ত।

সাইমন নিকোলাস যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানী অর্থনীতি বিষয়ক চিন্তাশালা ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিনানসিয়াল এনালিসিসের(আইইইএফএ)জ্বালানি অর্থনীতি বিশ্লেষক।

ভাষান্তর: মো. জহুরুলআলমামুন

  Light Mode
  Dark Mode